Subscribe Us

header ads

মানসিক রোগ ডিমেনশিয়া

পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ডিমেনশিয়া আক্রান্ত রোগী তারা কোনো হারানো জিনিস খুঁজতে থাকে, তারা ভাবতে থাকে যে, তাদের কোনো মূল্যবান জিনিস হারিয়ে গেছে তাই এসব জিনিস খুঁজতে খুঁজতে দিশেহারা হয়ে পড়ে। তখন অন্যের প্রতি আক্রোশ বা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, সে মনে করে তার ওই মূল্যবান জিনিসটি না পাওয়ার জন্য পরিবারের লোক বা সেবাদানকারী দায়ী।

ডিমেনশিয়া রোগীর আচরণ

ডিমেনশিয়ার কিছু কিছু রোগী সামান্য সমালোচনাও সহ্য করতে পারে না। তাদের নিয়ে কেউ কোনো রকম সমালোচনা করলেই তারা বাড়াবাড়ি রকমের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে থাকে। এ সময় তারা চিৎকার করে ওঠে, অযৌক্তিক ঘটনা ঘটায়, প্রচণ্ড রেগে যায়, ভায়োলেন্ট আচরণ করে, কান্নাকাটি করতে থাকে অথবা উচ্চ শব্দে হাসতে থাকে।

রোগীর এই অতিমাত্রায় প্রতিক্রিয়া রোগের একটি অংশ এবং একে বলা হয় Catastrophic Reaction. মাঝেমধ্যে ক্যাটাসট্রোফিক রিঅ্যাকশন একটি প্রথম নিদর্শন হিসেবে ডিমেনশিয়ার সাথে সম্পর্কযুক্ত হতে পারে। এটা এক ধরনের পাসিং ফেইজ, এটি অনেক সময় রোগের অগ্রসরের সাথে সাথে চলে যায় অথবা কোনো কোনো সময় এটি ডিমেনশিয়া রোগের সাথে সাথে কিছু সময়ের জন্য চলতে থাকে। ক্যাটাসট্রোফিক আচরণের কিছু ধরন হলো- পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী অতিরিক্ত স্ট্রেস বা মনোশারীরিক চাপ, দ্বন্দ্ব, অন্যান্য শারীরিক রোগবালাই।

মানসিক রোগ ডিমেনশিয়া

ডিমেনশিয়া রোগী সাধারণত অশান্ত কমই থাকে, তবে যখন অশান্ত হয় তখন তা নিয়ন্ত্রণ করাটা একটু কঠিন হয়ে পড়ে। রোগীর ক্যাটাসট্রোফিক প্রতিক্রিয়া হঠাৎ করেই দেখা দেয় এবং এটি পরিবার এবং সেবাযত্নদানকারীকে খুব ভীত করে দিতে পারে। যেমন- রোগী অনবরত চিৎকার করতে পারে, হুমকি দিতে পারে, আক্রমণাত্মক আচরণ করে, এলোমেলো আচরণ করে, তেড়ে আসে, ঘরের জিনিসপত্র ভেঙে ফেলে, নিজের ক্ষতি করতে চায় ইত্যাদি। এ সময় রোগীর পরিবার এবং সেবাদানকারী বুঝে উঠতে পারে না যে তারা কী করবে। এক ধরনের বিভ্রান্তিতে তারা ভুগতে শুরু করে। এ সময় রোগীর পরিবার এবং সেবাদানকারী ভীতু হয়, উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, অসহায়বোধ করে, লজ্জাবোধ করতে পারে, অপরাধবোধে ভুগতে পারে, মনোশারীরিক চাপে ভোগে, সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে, বিরক্ত হয় এবং উত্তেজিত বা রাগান্বিত হতে পারে।

আসলে এটা একটা কঠিন সময়। এ সময়টা অতিক্রান্ত করা সহজ ব্যাপার নয়। পরিবার এবং সেবাদানকারী রোগীর উল্টোপাল্টা আচরণের ফলে এক ধরনের অশান্তিবোধ করতে থাকে। তখন রোগীর সাথে কী রকম আচরণ করা উচিত তা বুঝে উঠতে পারে না। ফলে তারা রোগীকে বকা-ঝকা শুরু করে এবং রোগী আরও বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। তাই এ সময় রোগীর পরিবার এবং সেবাদানকারীকে কিছুটা ধৈর্য ধারণ করতে হবে। কারণ রোগীর সাথে সাথে নিজেরাও অবুঝ হয়ে উঠলে পরিণাম কখনোই ভালো হবে না। রোগীর ওপর পরিবারের সদস্য এবং সেবাদানকারী চড়াও হলে রোগী আরো বেপরোয়া হয়ে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দিতে পারে।

আসল কথা হলো পরিবার এবং সেবাদানকারীকে বুঝতে হবে যে রোগী যা করছে তা তার রোগের কারণেই। এখানে রোগই তাকে এসব বেপরোয়া আচরণ করতে বাধ্য করছে। তাই পরিবার এবং সেবাদানকারীর উচিত হবে যে কোন ফ্যাক্টর রোগীর ক্যাটাসট্রোফিক আচরণের জন্য ট্রিগার হিসেবে কাজ করে তা খুঁজে বের করা। এ সময় ডায়রি রাখা যায়, অর্থাৎ ডায়রিতে রোগী কোন কোন সময় বা কোন কোন পরিস্থিতিতে এ ধরনের আচরণ করে তা লিখে রাখা হলে এসব সমস্যাপূর্ণ আচরণ শনাক্ত করা সম্ভব হবে। তবে যদি রোগীর এসব আচরণের কোনো ফ্যাক্টর বা ট্রিগার খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে রোগীকে তার এলোমেলো আচরণের সময় কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, অর্থাৎ কোন উপায়ে বা কথায় বা কাজে রোগীকে আয়ত্তে আনা যায় তা খুঁজে বের করা দরকার।

পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ডিমেনশিয়া আক্রান্ত রোগী তারা কোনো হারানো জিনিস খুঁজতে থাকে, তারা ভাবতে থাকে যে, তাদের কোনো মূল্যবান জিনিস হারিয়ে গেছে তাই এসব জিনিস খুঁজতে খুঁজতে দিশেহারা হয়ে পড়ে। তখন অন্যের প্রতি আক্রোশ বা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, সে মনে করে তার ওই মূল্যবান জিনিসটি না পাওয়ার জন্য পরিবারের লোক বা সেবাদানকারী দায়ী।
  • ডিমেনশিয়ার রোগী যখন একাকী অনুভব করতে থাকে, তখন তার মনে এক ধরনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ জন্ম নেয় আর তা এক সময় প্রকাশ পায়।
  • রোগী যখন মনে করে যে সবাই তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে, অবহেলা করছে তখন তার মনে পুঞ্জিভূত ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
  • বর্তমানের কোনো স্মৃতি অতীতের কোনো স্মৃতিকে উসকে দিতে পারে-এর থেকেও রোগীর ক্যাটাসট্রোফিক আচরণ প্রকাশ পেতে পারে।
  • ডিমেনশিয়া রোগী ক্রমাগত তাদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায় হারাতে থাকে যেমন- বন্ধু-বান্ধব হারানো, পরিবার হারানো, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা-স্বামী এবং অর্থপূর্ণ জীবন হারানো। সুখের স্মৃতি ও স্বাস্থ্য সম্পদ হারাতে পারে।
এগুলো হারানো ঘটনা রোগীর মনে পুঞ্জীভূত হতে হতে এক সময় ক্যাটাসট্রোফিক প্রতিক্রিয়ার সাহায্যে এলোমেলো আচরণের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসে তার মনের কষ্ট। রোগী আসলে যে অস্বাভাবিক আচরণ প্রকাশ করে এতে করে সে আসলে এক ধরনের দ্বন্দ্বে ভুগতে থাকে, সে তখন অন্যের সাহায্য চায়, সহানুভূতি চায়। রোগীর এসব চাওয়া সজ্ঞানে বা নির্জ্ঞানে উভয়ভাবেই হতে পারে।

তাই এসব ব্যাপার রোগীর পরিবার এবং সেবাদানকারীর বোঝা প্রয়োজন। রোগীকে তিরস্কার না করে, তাকে মমতা দিন, তার পাশে দাঁড়ান, তার আচরণের কারণ বুঝতে চেষ্টা করুন, তার সাথে নম্রভাবে নিচু কণ্ঠে কথা বলুন। রোগীকে বুঝতে দিন আপনি বা আপনারা তার আপনজন। তার ভালো আপনাদের একমাত্র চাওয়া-এসব কথা বুঝতে পারলে রোগী কিছুটা হলেও শান্ত হবে। প্রয়োজনে এ সময় ডাক্তারের পরামর্শ নিন। ডাক্তারকে খুলে বলুন রোগীর এলোমেলো আচরণের কথা।

ডিমেনশিয়া আচরণকে পরিবর্তন করে

ডিমেনশিয়া রোগটি ব্যক্তির আচরণ পরিবর্তন করে দিতে পারে। আচরণের পরিবর্তন এ রোগের একেবারে কমন বিষয়। কিন্তু এ ধরনের পরিবর্তন পরিবার ও সেবাদানকারীর জন্য প্রচুর স্ট্রেসের কারণ হতে পারে। যে মানুষটি অতীতে নম্র-ভদ্র এবং মমতাপূর্ণ আচরণের ছিল সে একই মানুষ আচরণ পরিবর্তনজনিত কারণে কেমন যেন অপরিচিত এবং অ্যাগ্রেসিভ হয়ে ওঠে, এটি এক ধরনের আপসেটের ব্যাপার।

আচরণ পরিবর্তনের কারণ

ডিমেনশিয়া রোগটি মানুষকে নানাভাবে আক্রান্ত করে। ডিমেনশিয়ার রোগী কেন অন্য রকমভাবে আচরণ করে তা বুঝতে পারা রোগীর পরিবার এবং সেবা-যত্নদানকারীর জন্য রোগের সাথে পেরে ওঠার ক্ষেত্রে সাহায্য করবে। মানুষের আচরণের পরিবর্তন কেন ঘটে থাকে তার অনেক কারণই থাকতে পারে। ডিমেনশিয়া হলো মস্তিষ্কে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের কারণ, যা প্রভাব ফেলে রোগীর স্মৃতিশক্তিতে, মন-মেজাজে এবং আচার-আচরণে।

মাঝেমধ্যে মস্তিষ্কের মধ্যে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের সাথে আচরণের সম্পর্ক থাকে এবং রোগীর আচরণ বদলে যায়। আবার অন্যদিকে, আচরণের পরিবর্তনের ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করতে পারে ব্যক্তির পরিবেশ, পরিস্থিতি, স্বাস্থ্য সমস্যা এবং ওষুধের প্রতিক্রিয়া।

আচরণের পরিবর্তন ডাক্তারকে জানান

ব্যক্তির আচরণের পরিবর্তন দেখা দিলে এ বিষয় নিয়ে ডাক্তারের সাথে আলোচনা করুন। ডাক্তার এটা চেক করে দেখবেন যে, রোগীর কোনো শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতা আছে কি না এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন। যদি কোনো মানসিক সমস্যার দরুন এমনটি হয় তাহলে ডাক্তার তার সম্পর্কেও পরামর্শ প্রকাশ করবেন। পরিবর্তিত আচরণের সাথে পেরে ওঠা রোগী এবং রোগীর পরিবার ও সেবাদানকারীর জন্য কঠিন হতে পারে। ডিমেনশিয়া রোগীর রাগ এবং আক্রমণাত্মক আচরণ রোগীর পরিবার ও সেবাদানকারীর প্রতি প্রকাশ হতে পারে কারণ এরা রোগীর খুব নিকটের। রোগীর আচরণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে হতে পারে এবং এর দ্বারা সে তার পরিবার ও সেবাদানকারীকে ভীতু করতে পারে; তাই এ সময় প্রয়োজন রোগীকে সান্ত্বনা দান করা। যদিও কোনো কোনো সময় এটি কাজে আসতে চায় না। এক্ষেত্রে প্রয়োজন হলো-শান্ত পরিবেশ তৈরি করা, চাপহীন পরিবেশ রোগীকে উপহার দিন-এটি কিছু কিছু কঠিন আচরণ এড়িয়ে যেতে সাহায্য করবে, রোগীর বসবাসের পরিবেশকে যথাসম্ভব পরিচিত রাখার চেষ্টা করা প্রয়োজন।

ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি বিচলিত হয়ে উঠতে পারে যদি তারা তাদের বসবাসের স্থানকে অপরিচিত দেখতে পায় অথবা তাদের সামনে যদি অনেক অপরিচিত মানুষজন দেখতে পায় তখনো তাদের আচরণে প্রভাব পড়তে এবং তারা সে সময়ে এক ধরনের বিভ্রান্তিতে ভুগতে শুরু করে এবং তারা পরিবর্তিত আচরণের সাথে পেরে ওঠে না। যদি রোগীর আচরণ কঠিন আকার ধারণ করে তাহলে তখন রোগীর সাথে কোনো শারীরিক কন্টাক্ট করা যাবে না যেমন- হাত দিয়ে তাদের ধরে রাখা, তাকে ধরে অন্যদিকে যাওয়ার জন্য টেনে নিয়া বা পেছনের দিক থেকে ধরে কিছু বলা।

এ সময় রোগীকে একাকী ছেড়ে দিন যতক্ষণ না পর্যন্ত তার পরিবর্তিত আচরণের হ্রাস ঘটে বা নিয়ন্ত্রণে আসে। রোগীর পরিবর্তিত নিয়ন্ত্রণহীন আচরণ প্রকট আকার ধারণ করলে বন্ধু-বান্ধবকে ডাকুন, কোনো সাপোর্টকারীকে ডাকুন, কোনো প্রতিবেশীকে ডাকুন, রোগীর আচরণ ব্যক্তিগতভাবে পরিবর্তন করবেন না, রোগীর সামনে উচ্চকণ্ঠে কথা বলা থেকে বিরত থাকুন, রোগীকে ধমক দেবেন না, শান্তভাবে আস্তে আস্তে কথা বলুন, সান্ত্বনার স্বরে কথা বলুন, রোগীকে তার পরিবর্তিত আচরণের কারণে কোনো প্রকার শাস্তি দিতে যাবেন না। রোগী তার আচরণের পরিবর্তনের কারণে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা মনে করতে পারে না। তাই রোগী এ থেকে কোনো শিক্ষা নিতে পারে না। রোগীর অনিয়ন্ত্রিত আচরণের সময় যথা সম্ভব রোগীর কাছ থেকে দূরে সরে থাকুন। এ সময় কোনো উত্তেজিত কথা বলবেন না বা খোঁচা দিয়ে কোনো কথা বলতে যাবেন না। কোনো প্রকার যুক্তি-তর্ক থেকে | বিরত থাকুন, অ্যাগ্রেশন-আক্রমণাত্মক ভাব এটা হতে পারে শারীরিক আঘাতমূলক, অ্যাবিউসিভ ভাষা বা মৌখিক অ্যাগ্রেসিভ বিহেভিয়ারে প্রায়ই রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। অথবা এটি কোনো ভয় বা দ্বন্দ্বের কারণেও ঘটতে পারে। মনে রাখবেন-দ্বন্দ্বের কারণে অ্যাগ্রেশন বা আক্রমণাত্মক ভাবে সৃষ্টি হতে পারে। যেমন গেট লক করে রাখার কারণে রোগী এখানে-সেখানে ঘোরাঘুরি করতে পারে না, কিন্তু তার মধ্যে এ নিয়ে এক প্রকার দ্বন্দ্ব ঠিকই জন্ম নেয়। অ্যাগ্রেসিভ বা আক্রমণাত্মক আচরণ রোগী যা চায় তা পাওয়ার জন্য উপায় হতে পারে, তবে এটি রোগীর সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘটে থাকে। নানা রকমের তৎপরতা আচরণের বিস্ফোরণ প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে। ব্যায়াম পরিবর্তিত আচরণের বহিঃপ্রকাশ কিছুটা প্রতিরোধ করতে পারে।

আক্রমণাত্মক আচরণ ম্যানেজ করা

আপনি কী করতে চাচ্ছেন তা সংক্ষিপ্ত ও পরিস্কার বাক্যে রোগীকে বলুন, যেমন- বলতে পারেন আমি তোমার ময়লা কাপড় পরিবর্তন করতে তোমাকে সাহায্য করব। এটা বা এই ধরণের স্পষ্ট ও ছোট বাক্য বলতে রোগী বুঝতে পারবে যে, সে কোনো আক্রমণ বা হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে না- তাই রোগী আশ্বস্ত হতে পারবে। ব্যক্তির চাহিদা পূরণের চেষ্টা করুন। ব্যক্তিকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, আপনি তার হিতাকাঙ্ক্ষী, তার সাহায্য করাই আপনার উদ্দেশ্য।

কর্মতৎপরতা

প্রতিটি দিনে জীবনের এমন কিছু জিনিস থাকে যা আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য এবং আনন্দ দিয়ে থাকে। ডিমেনশিয়া রোগীর ক্ষেত্রে গুণগত জীবনের চাহিদা কমে যায় না। পরিবারের এবং সেবা-যত্নকারীর সহযোগীতা ছাড়া ডিমেনশিয়ার রোগীর ক্ষেত্রে জীবনের উদ্দেশ্য ও আনন্দ পাওয়া খুবই কঠিন বিষয়। অনেক পথ বা উপায়ের মাধ্যমে ডিমেনশিয়ার রোগীর কর্মতৎপরতা সচল রাখার চেষ্টা করা যায়। যেমন- কোনো সক্ষতার ক্ষতি হয়ে যাওয়াকে পূরণ করার তৎপরতা, রোগীর মর্যাদাবোধকে চাঙা করা, বাড়িতে শেখা ও জানা দক্ষতাগুলো চর্চা করা, নতুন শিখন থেকে রোগীকে যথাসম্ভব বিরত রাখা, রোগীর জন্য আনন্দদায়ক বা মজার সুযোগ তৈরি করা, সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানো, ব্যক্তির ব্যাকগ্রাউন্ডকে মূল্য দেয়া এ ব্যাপারে সেনসিটিভ মনোভাব রাখা, ব্যক্তিকে রোগের সময় ও আদর্শ করে রাখবে এমন বিষয়গুলো বিবেচনা করা। কোন বিষয়গুলো রোগীকে আদর্শ রাখতে সাহায্য করবে তা বুঝতে সাহায্য করবে এ রকম বিষয়গুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করা। এসব বিষয় বলতে বোঝায় ব্যক্তির অতীত জীবনধারা বা লাইফস্টাইল, কাজের ইতিহাস, শখ, বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড, সামাজিক আকর্ষণমূলক বিষয়, অতীত ভ্রমণ, অতীত অভিজ্ঞতা, গুরুত্বপূর্ণ জীবনের ঘটনা, আন্তসম্পর্ক, পারিবারিক সম্পর্ক এবং বন্ধু-বান্ধব।

কর্মতৎপরতা পুরনো নিয়মে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রোগী ডিমেনশিয়া রোগের কারণে অনেক কিছুই ভুলে যায় কিন্তু যেসব কর্মতৎপরতা তার এখনো মনে আসে সেগুলো সচল রাখার চেষ্টা করা। এসব কর্মতৎপরতার মধ্য থাকতে পারে পাউরুটিতে মাখন মাখানো, কোনো কিছু ধোয়া, পানি দেয়া, ঘর ঝাড়ু দেয়া, বাগান করা, চায়ে চিনি দেয়া, খাবার প্লেট পরিষ্কার করা, কাপড় ভাঁজ করা, চাদর বিছানো, বই-পুস্তক গোছগাছ করে রাখা, বইয়ের মলাট লাগানো, রুটি ছিঁড়ে খাওয়া ইত্যাদি।

যে কাজগুলো রোগীকে সান্ত্বনা আনন্দ দেয় যেমন বাড়ির বাইরে বেড়ানোকে উপভোগ করতে পারে। যদিও তারা মনে করতে পারে না যে তারা কোথায় আছে। আসল কথা হলো যদিও রোগী তার অভিজ্ঞতাগুলো ভুলে যায় তবুও মুহূর্তের এনজয়টা সে ঠিকই দারুণভাবে উপভোগ করে নেয়। এটা রোগীর জন্য উপকারী। রোগীকে একটি কর্মতৎপরতার প্রতি মনোযোগী করুন, একবারে একটি আদেশ বা পরামর্শ দিন এবং কর্মতৎপরতাকে সহজ-সরলভাবে সমাপ্ত হতে দিন।

ডিমেনশিয়া রোগীর ক্ষেত্রে নিরাপদ কর্মক্ষেত্র তৈরি করা জরুরি। রোগীর প্রায়ই দৃষ্টিগত অনুভূতি বা ধারণা সমস্যা দেখা দেয় এগুলো যেমন- রোগীর কর্মতৎপরতার স্থানটি জঞ্জালমুক্ত পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করুন। মনোযোগহীনতার কারণ কমিয়ে আনুন, যতটা সম্ভব কোলাহলপূর্ণ অবস্থা কমিয়ে রাখুন। প্রতিচ্ছবি বা প্রতিবিম্ব ছাড়া ভালো/পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করুন। রোগীর পছন্দনীয় স্থানে বা জিনিসে বসার ব্যবস্থা করুন। রোগীর কর্মতৎপরতার স্থানে উচ্চতা সব ঠিক অবস্থানে রাখার চেষ্টা করুন।

যেসব কাজ বা কর্মতৎপরতা স্ট্রেস বাড়ায় সেগুলো পরিহার করুন। যেসব কাজ বা কর্মতৎপরতা রোগীর মাঝে চাপপূর্ণ অবস্থা বা স্ট্রেস বৃদ্ধি করে সে ধরনের কাজ বা কর্মতৎপরতা এড়িয়ে চলুন। রোগীর কাছ থেকে দূরে রাখুন। রোগীর কাজের দক্ষতা একই দিনে বা দিনে দিনে ওঠানামা করতে পারে। যদি কোনো কাজ আজকে সফলতার সাথে সম্পাদনা করা হয়নি, তাহলে তা রোগীকে অন্য সময়ে বা অন্যদিনে করতে দিন। কারণ আজ যে কাজটিতে রোগী আগ্রহ দেখায়নি বা ঠিকঠাকমতো করতে পারেনি, পরবর্তী কোনো এক সময় আগ্রহ দেখা দিলে কাজটি করতে দেয়া যেতে পারে।

দিনের যে সময়ে রোগী ভালোভাবে তৎপরতা চালাতে পারে, সে সময় বেছে নিন। যেমন রোগীর কোনো কোনো সময় সকাল বেলা হাঁটতে ভালো লাগতে পারে। আবার কোনো কোনো সময় দুপুর বেলার দিকে ভালো লাগতে পারে। অবশ্য যেসব ডিমেনশিয়ার রোগী অস্থির থাকে দিনের শেষ বেলায় অথবা যেসব রোগী দিনের বেশির ভাগ সময়ই চুপচাপ বা নীরবভাবে কাটায় তার জন্য দুপুরের একটু পরের দিকে হাঁটাহাঁটি ভালো লাগতে পারে।

রোগীকে কোনো কাজেই অতিরিক্ত চাপ দেবেন না। কারণ এতে করে রোগীর মধ্যে উদ্বিগ্নতা তৈরি হতে পারে। যেমন বাইরে যাওয়ার বা বাইরে ঘোরাফেরা করার জন্য রোগীকে-ভিড়ের মধ্যে যেতে চাপ দেবেন না, তাড়াতাড়ি হাঁটতে বাধ্য করা যাবে না, চিৎকার-চেঁচামেচিপূর্ণ পরিবেশে জোর করে নিয়ে যাওয়ার ঠিক হবে না, রোগীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে উৎসাহিত করার জোর চেষ্টা করা যাবে না।

ডিমেনশিয়া রোগীর কর্মতৎপরতাকে সহজভাবে নিন এবং তাকেও সহজভাবে নেয়ার জন্য উৎসাহিত করুন। এ উৎসাহদান একদিনে সম্ভব নয়। এর জন্য বেশ কিছুদিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তাই এ সময় অধৈর্য হলে চলবে না। ধৈর্য রাখতে হবে।

রোগীর পাশে থাকুন

ডিমেনশিয়া রোগীর ক্ষেত্রে সাপোর্টিভ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পরিবারের সাহায্য এবং সেবাকারীর সেবা রোগীকে রোগের কাঠিন্যতার মাঝেও অনেকটা উপকারী ভূমিকা পালন করে থাকে। রোগের প্রাথমিক পর্যায় থেকে রোগীর পাশে সাহায্যের ও সেবার হাত বাড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন। এতে করে রোগী এবং রোগের দূঢ়তার সাথে লড়াই চালানোর মতো মনোবল অর্জন করতে পারবে। ডিমেনশিয়া রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে রোগী আইনস্মত কোনো ডকুমেন্ট স্বাক্ষর করতে পারেন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাও করতে পারেন, অভিভাবকত্ব পালন করতে পারেন, কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে এ সময় নির্ভরযোগ্য এবং যোগ্যতাসম্পন্ন লোক রোগীর সাথে থেকে এসব ব্যাপার পর্যবেক্ষণ করতে পারেন এবং কোনো সমস্যা থাকলে তা রোগীকে ধরিয়ে দিতে পারেন।

ডিমেনশিয়ার রোগীর রোগের পর্যায় যখন একটু একটু করে গিয়ে যেতে থাকে তখন রোগীও একটু একটু করে অক্ষমতার দিকে যেতে থাকে, রোগের অগ্রসরতা কারো ক্ষেত্রে হতে পারে আস্তে, আস্তে আবার কারো ক্ষেত্রে হতে পারে দ্রুতগতিতে। রোগীর অক্ষমতার সময় রোগী আগে যা যা বলতে পারত তা আর বলতে পারে না। তাই এ সময় রোগীকে সাপোর্ট করা প্রয়োজন। এ সময় রোগীকে নানাভাবে সাপোর্টের জন্য এগিয়ে আসতে হবে। সবার সম্মিলিত ও একক প্রচেষ্টায় রোগীর অনেক উপকার সাধিত হয়। রোগী অনেক সময় বুঝতে পারে যে তার পাশে সবাই আছে। এতে করে রোগীর মনের হতাশা অনেকাংশে কেটে যায়।

ডিমেনশিয়ার রোগী রোগের আগে ছিল কর্মঠ, চঞ্চল, উদ্যমী, কিন্তু সেই একই লোক রোগের আঘাতে হয়ে পড়ে অক্ষম। এ অক্ষমতা শক্তির চেয়ে জ্ঞানের অক্ষমতা। জ্ঞান বলতে স্মরণশক্তির অক্ষমতা। এই কারণেই রোগী নিজে নিজে বাইরে যেতে পারে না, গেলেও পথ ভুলে যায়, নিজে নিজে রোগী খেতে পারে না, কাপড়-চোপড় পরতে পারে না, মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে না, ভাব বিনিময় করতে পারে না, নিজের যে সমস্যা হয়েছে তাও অনেক সময় বুঝতে পারে না, নিজের যত্ন নিজে নিতে পারে না।

ডিমেনশিয়া রোগটি এমনই একটা ঝড়ের মতো যা রোগীর সুন্দর জীবনকে এলোমেলো করে দেয়। রোগী হয়ে পড়ে নির্ভরশীল। আসলে এটা একটি কঠিন সময় রোগী ও তার পরিবারের জন্য। এ সময় এর প্রভাব পরিবারের প্রতিটি সদস্যের ওপর গিয়ে পড়ে। এ সময় পরিবারের কোনো কোনো সদস্য রোগীর চিন্তায় বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়। তখন তার বিষণ্ণতা আবার নতুন করে পরিবারের জন্য ভোগান্তির কারণ হতে পারে। তাই এই কঠিন সময়ে পরিবারের সবাইকে নিজ নিজ মনোবল অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করতে হবে এবং সহজভাবে পরিস্থিতিকে মেনে নিয়ে, কঠিন অবস্থা মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিতে হবে। এ সময় পরিবারের সদস্যরা যদি মনোবল হারিয়ে ফেলে তাহলে তার প্রভাব গিয়ে পড়বে ডিমেনশিয়ার রোগীর ওপর। আর এতে করে চিকিৎসা এবং সাপোর্ট দুটো বিষয়ই বাঁধার সম্মুখীন হবে। এ সময়ে ডিমেনশিয়ার রোগীর পরিবার প্রয়োজনে মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে কাউন্সিলিং করতে পারে। এ কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে রোগীর পরিবারের সদস্যরা নিজেদের সামলে নিতে সক্ষম হয়।

ডিমেনশিয়ার রোগীকে সবারই ভালোবাসা দরকার। কারণ এই রোগগ্রস্ত ব্যক্তি হয়তো কোনো এক সময় পরিবারের জন্য অনেক কিছু করেছেন বা করার চেষ্টা করেছেন, তাই তার অবদান, তার ভালোবাসা ভুলে গেলে চলবে না। ডিমেনশিয়া রোগ যত বড়ই হোক পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত সহযোগিতায় অনেক সহজ হয়ে আসে।

অবহেলা করবেন না

ডিমেনশিয়া একটি মস্তিষ্ক কোষের মৃত্যুজনিত রোগ। এই রোগে অনেকগুলো রোগ লক্ষণ বা উপসর্গ প্রকাশ পায়। ডিমেনশিয়ার অনেক কারণ দেখা যায়। ডিমেনশিয়ার অধিকাংশ মানুষই ‍বৃদ্ধ, কিন্তু এ কথাও মনে রাখার মতো যে, প্রতিটি বৃদ্ধেরই আবার এ রোগটি হয় না। কার ক্ষেত্রে রোগটি দেখা যাবে তা আগে থেকে বলার উপায় নেই বা এমন কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষাও নেই যে, যার দ্বারা বলা যায় ডিমেনশিয়া রোগটি হবে। এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরে বোঝা যায়, রোগ নির্ণয় করা যায়। তবে ডিমেনশিয়ার রোগ নির্ণয় করাটা ততটা সহজ নয়। কারণ রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটাকে চিনতে পারা প্রায় সময়ই একটু কঠিন হয়ে থাকে। তবে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এক পর্যায়ে রোগটি ঠিকই শনাক্ত করতে পারেন। ডিমেনশিয়া রোগটি বয়সের কোনো অংশ নয়। এ রোগটি সবার ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে। কিন্তু এটি সাধারণত দেখা যায় এ রোগটি ৬৫ বছর বয়সের পরই আঘাত হানতে শুরু করে। এ ছাড়া ৪০-৫০ বছর বয়সী লোকরাও এ জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত রোগীর মন খারাপ হতে পারে। এ অবস্থা রোগীকে দিনের পর দিন হতাশায় দিকে নিয়ে যায়। এ সময় রোগীর কোনো কিছু করতেই ভালো লাগে না। সারাক্ষণ মন খারাপ নিয়ে ঘরে চুপচাপ বসে থাকার প্রবণতা দেখা দেয়। এ সময় রোগীর আনন্দদায়ক কাজেও আনন্দ লাগে না। আগে যেসব কাজকর্মে আনন্দ পেত এ সময়ে আর তা হয় না।

মন খারাপের কারণে বিষণ্ণতায় রোগীর মাঝে আত্মগ্লানির সৃষ্টি হতে পারে। ফলে রোগী অপরাধবোধে ভোগে, তার নিজের কাছে নিজেকে অতীতের নানা ব্যাপারে অপরাধবোধ জাগতে শুরু করে। রোগীর ওজন কমতে শুরু করে, কারণ রোগী ঠিকমতো খায় না, খাওয়া দেখলেই তার কান্না আসে। আবার এমনও যে, রোগী সারাদিন ঘরেই থাকতে থাকে আর বারে বারে এটা-সেটা খেতে থাকে। এর ফলে কোনো কোনো সময় রোগীর দেহের ওজন বেড়ে যায়, দেখা দেয় অন্যান্য সমস্যা।

ডিমেনশিয়া রোগীকে অবশ্য ভালো পরামর্শদান, পরিচিত এবং ভারসাম্যপূর্ণ সেটিং বজায় রেখে কখনো কখনো ভ্রমণ আনন্দদায়ক ও কম ঝুঁকিপূর্ণ করা যায়। এমন অনেকগুলো উপসর্গ বা চিহ্ন থাকে যা দেখলে আপনাকে রোগীর ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে এবং এসব উপসর্গ ও চিহ্ন তখন হবে ভ্রমণের জন্য অনুপযোগী। এগুলো হলো- রোগীর অব্যাহত অসহযোগিতা, উত্তেজনা, ভ্রমণের জন্য গিয়ে কিছু সময়ের মধ্যেই বাড়িতে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে, অশ্রুপূর্ণ চোখ/ক্রন্দনপ্রবণ, উদ্বিগ্নতা, ভিড় বা লোকারণ্য পরিবেশ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়া, কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে অস্থির হয়ে ওঠা, গারান্বিত হতে থাকা, এলোমেলো আচার-আচরণ। আক্রমণাত্মক আচার-আচরণ এ সময় রোগীকে অধৈর্য করে তুলতে পারে। ভ্রমণের পরিবেশে গিয়ে রোগী শান্ত না হয়ে কথায় কথায় মারমুখী হয়ে ওঠা ভ্রমণের বিরুদ্ধে সতর্কতামুলক চিহ্নবিশেষ।

ডিমেনশিয়া রোগীর ক্ষেত্রে ভুলোমন একটি কমন সমস্যা। ভুলোমনের কারণে রোগীর দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব পড়ে, ফলে দেখা দেয় নানা সমস্যা। ডিমেনশিয়া একটি মারাত্মক ধরনের ব্রেইনের রোগ। এ সময় শারীরিক ও মানসিক সমস্যা অনেক সময় দেখা দেয়। যেমন শারীরিক ঝুঁকির মধ্যে হতে পারে: ভুলে যাওয়ার কারণে গরম পানিতে হাত দেয়া, আগুনে হাত দেয়া, বিভ্রান্ত ও হ্যালুসিনেশনে কষ্ট পাওয়া, এলোমেলো আচরণের কারণে অন্য মানুষ থেকে বিচ্ছেদ হওয়ার কষ্ট অনুভব করে।

ডিমেনশিয়া রোগটিকে আমাদের দেশে প্রায়ই অবহেলা করা হয়ে থাকে। মনে করা হয় ভুলে যাওয়া বা স্মৃতিশক্তি হারিয়ে যাওয়া কি কোনো রোগ হতে পারে? মানুষের এ ধরনের ভাবনা রোগীর প্রতি অবহেলা এবং চিকিৎসা সেবা নেয়া থেকে দূরে ঠেলে দেয়। পরিণামে রোগীর রোগ শনাক্তহীন, সতর্কহীন এবং চিকিৎসাহীন অবস্থায় থাকে। যার ফলে রোগীর রোগের অগ্রসরমান সমস্যার প্রকোপ বাড়তে থাকে, রোগীর উপসর্গ বাড়তে তাকে, এ সময় হয় রোগীর কোনো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে বা রোগীর রোগজনিত আচার-আচরণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে অন্যরা এবং অযথাভাবেই ডিমেনশিয়া রোগী ডিমেনশিয়া রোগ ছাড়াও অন্যান্য চিকিৎসাযোগ্য রোগের সমস্যায় অযথাই কষ্ট পেতে থাকে। যা কারোর কাম্য হওয়া উচিত নয়।

ডিমেনশিয়া রোগ এবং রোগী সম্পর্কে আমাদের জানা প্রয়োজন। কারণ আজ অন্যের ডিমেনশিয়া হয়েছে হয়তো আগামীকাল আপনার বা আমারও এ রোগ দেখা দিতে পারে।

ভ্রমণ করা

অনেক পরিবার এবং ডিমেনশিয়া রোগীর সেবাদানকারী ডিমেনশিয়া রোগীকে সাথে নিয়ে ভ্রমণ করতে আনন্দ পায় এবং তাদের অলস সময়গুলোকে ভ্রমণের আনন্দে বিলিয়ে দিতে চায়। কিন্তু ডিমেনশিয়া রোগীকে নিয়ে ভ্রমণ করা অনেকগুলো ঝুঁকির সৃষ্টি করে এবং তা এক ধরনের চ্যালেঞ্জরও বিষয়। ডিমেনশিয়া রোগীকে নিয়ে ভ্রমণ করতে যাওয়ার জন্য ভালো সময় হলো রোগের প্রাথমিক স্টেজ। কারণ এ স্টেজে রোগের উপসর্গ কিছুটা কম থাকে আর রোগ যতই অগ্রসর হয় ততই রোগীর মাঝে দেখা দিতে পারে খুব অগোছালোভাব, উত্তেজিত এবং বিষণ্ণ।

ডিমেনশিয়া রোগীর বেলায় এটা খুবই কমন ব্যাপার যে, রোগী তার ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কথা ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধির কথা ভুলে যায় বা এ ব্যাপারে আগ্রহ হারায়। তারা হয়তো এ সময় তাদের প্রাত্যহিক জীবনের জরুরি কাজ যেমন গোসল করা এবং কাপড়-চোপড় বদলানোর মতো কাজকে এড়িয়ে যায় বা তাচ্ছিল্য করে। এটা ডিমেনশিয়ার সেবা-যত্নদানকারীর জন্য হয়ে ওঠে হতাশা ও বিভ্রান্তিকর কারণ। এর কারণ জানতে চেষ্টা করা সেবাযত্নদানকারীর জন্য উপকারী হবে এবং কোন পন্থায় কাজটি সম্পন্ন করার যায় তার পথও খুঁজে বের করা সহজ হবে।

ডিমেনশিয়া রোগীকে অবশ্য ভালো পরামর্শদান, পরিচিত এবং ভারসাম্যপূর্ণ সেটিং বজায় রেখে কখনো কখনো ভ্রমণ আনন্দদায়ক ও কম ঝুঁকিপূর্ণ করা যায়। এমন অনেকগুলো উপসর্গ বা চিহ্ন থাকে যা দেখলে আপনাকে রোগীর ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে এবং এসব উপসর্গ ও চিহ্ন তখন হবে ভ্রমণের জন্য অনুপযোগী। এগুলো হলো- রোগীর অব্যাহত অসহযোগিতা, উত্তেজনা, ভ্রমণের জন্য গিয়ে কিছু সময়ের মধ্যেই বাড়িতে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে, অশ্রুপূর্ণ চোখ/ক্রন্দনপ্রবণ, উদ্বিগ্নতা, ভিড় বা লোকারণ্য পরিবেশ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়া, কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে অস্থির হয়ে ওঠা, গারান্বিত হতে থাকা, এলোমেলো আচার-আচরণ। আক্রমণাত্মক আচার-আচরণ এ সময় রোগীকে অধৈর্য করে তুলতে পারে। ভ্রমণের পরিবেশে গিয়ে রোগী শান্ত না হয়ে কথায় কথায় মারমুখী হয়ে ওঠা ভ্রমণের বিরুদ্ধে সতর্কতামুলক চিহ্নবিশেষ।

প্যারানয়েড বা সন্দেহপূর্ণ আচরণ যেমন রোগী ভ্রমণ করতে গিয়ে নানা মানুষকে নানাভাবে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। যে ভাবে যে এই ভ্রমণের পরিবেশে আসার পর কেউ তার পেছনে লেগেছে, তাই এ পরিবেশটি নিরাপদ নয়- এ সন্দেহের বসে রোগী বাড়ি যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠতে পারে। এ অবস্থায় রোগী নানা রকম ভ্রান্ত বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে অন্যকে ভুল বুঝতে শুরু করে। রোগী ভাবে এই ভ্রমণে তাকে প্ল্যান করে নিয়ে আসা হয়েছে মেরে ফেলার জন্য বা তার ক্ষতি করার জন্য। এসব নানা ধরনের ডিলিউশনের কারণে রোগীর কাছে ভ্রমণটা হয়ে উঠতে পারে ভীতির কারণ।

গোসল এবং পরিষ্কার পরিচ্ছতা

ডিমেনশিয়া রোগীর বেলায় এটা খুবই কমন ব্যাপার যে, রোগী তার ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কথা ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধির কথা ভুলে যায় বা এ ব্যাপারে আগ্রহ হারায়। তারা হয়তো এ সময় তাদের প্রাত্যহিক জীবনের জরুরি কাজ যেমন গোসল করা এবং কাপড়-চোপড় বদলানোর মতো কাজকে এড়িয়ে যায় বা তাচ্ছিল্য করে। এটা ডিমেনশিয়ার সেবা-যত্নদানকারীর জন্য হয়ে ওঠে হতাশা ও বিভ্রান্তিকর কারণ। এর কারণ জানতে চেষ্টা করা সেবাযত্নদানকারীর জন্য উপকারী হবে এবং কোন পন্থায় কাজটি সম্পন্ন করার যায় তার পথও খুঁজে বের করা সহজ হবে।

অনেকভাবেই রোগীর ব্যক্তিত পরিচর্যা বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা যায়। তাই এসব ব্যাপর সমাধা করতে হলে কিছু পন্থা অবলম্বন করা যায় এবং এগুলো রোগীর সাথে কোনো তর্ক-বাগবিতণ্ডা না করেই করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে রোগীকে সান্ত্বনা দান এবং সেবাদানকারীর ধৈর্য এরকম বাধা দূর করতে সাহায্য করতে পারে।

শারীরিক ধোয়া-মোছা এবং কাপড়-চোপড় পরা একটি গোপন বিষয় অর্থাৎ এটি লজ্জা-শরমের সাথে জড়িত। এগুলো হলো ব্যক্তিগত বিষয়। অনেক মানুষই অন্যের সামনে কাপড় বদলাতে চায় না কারণ এটা অস্বস্তিকর বিষয় এবং অন্যজনের দ্বারা কাপড়-চোপড় পরিধান করা এক ধরনের অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় ডিমেনশিয়ার রোগীর কাছে। আসলে এটা সবার বেলাতেই এমনটা মনে হতে পারে। তাই রোগী এ সময় অন্যের সাহায্যে গোসল করা বা কাপড়-চোপড় পরিবর্তন করানোর কাজটিকে রিফিউজ করতে পারে এবং তাদের পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারটাকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারে। এ সময় আপনি দরজা লাগিয়ে দিন বা পর্দা ফেলে দিন, এতে করে রোগীর মনে প্রাইভেসির অনুভূতি জেগে উঠবে। রোগী যদি তার নিজেকে চিনতে না পারে তাহলে রোগীর সামনে একটি বড় আয়না রাখুন যাতে করে আয়নাতে রোগী নিজেকে দেখতে পায়। রোগী হয়তো এক ধরনের অস্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারে গোসল বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজের বেলায়। পরিচ্ছন্নতা বা ড্রেসিং রুমটি হয়তো খুব গরম বা ঠাণ্ডা হতে পারে অথবা খুব অন্ধকার হতে পারে অথবা বদ্ধ ঘরে বা বদ্ধ জায়গায় রোগীর ফোবিয়া তৈরি হতে পারে।

রোগী হয়তো প্রতিদিন গোসলে অভ্যস্ত নয়। হয়তো অতীতে রোগী এখনকার মতো প্রায় প্রতিদিনই গোসল করেনি। তাই এ সময় তার কাছে একটু অন্য রকম লাগতেই পারে। তাই এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে আপনার নিজের রুচি অনুযায়ী কত ঘর ঘন গোসল করা দরকার তা জন্য জোরাজুরি করা থেকে বিরত থাকুন। কারণ রোগীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বেশি মাত্রায় চাপ প্রয়োগ উপকারের চেয়ে বেশি অপকার ডেকে আনতে পারে। আর এতে করে আসল উদ্দেশ্য বা কর্মটিই ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।

পানির ভয়

পানির ভয় ডিমেনশিয়া রোগীর জন্য মাঝেমধ্যে একটি সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে। রাগী অনেক সময় পানির তাপমাত্রার কথা উপলদ্ধি করতে পারে না। তাই সে পানি দেখেই ভয় পেতে পারে। আবার রোগীর গোসলের সময় পড়ে যাওয়ার ভয়ও আরেকটি সমস্যা। ভয়ে নিয়ন্ত্রণহীন এবং নিথর দাঁড়িয়ে থাকা এগুলোও গোসলের সময় রোগীকে অসহযোগী করে তুলতে পারে।

Post a Comment

0 Comments